www.HelloBangla.News – আন্তর্জাতিক – ২ জানুয়ারি, ২০২৫: গাজার ফিলিস্তিনিরা নতুন বছরেও যুদ্ধের ভয়াবহতা আর মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। শুধু ২০২৪ সালেই প্রাণ হারিয়েছেন ২৩,৮৪২ জন, আহত হয়েছেন প্রায় ৫২ হাজার। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই মৃত্যু আর ধ্বংসযজ্ঞ ইসরায়েলের অবরোধ ও বোমাবর্ষণের ফল, যা মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও জাতিসংঘ গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে।
বিধ্বংসী পরিস্থিতি ও বাস্তুচ্যুতি
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে হাসপাতাল, ত্রাণ শিবির এবং এমনকি নিরাপদ অঞ্চলগুলোতেও আক্রমণ চালাচ্ছে। উত্তর গাজায় খাদ্য, পানি এবং চিকিৎসাসেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জাতিসংঘের মতে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড গণহত্যার বৈশিষ্ট্য বহন করে।
গাজার সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ইসরায়েল এখন পর্যন্ত ৩৪টি হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়েছে এবং ৮০টিরও বেশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র কার্যত অচল। কয়েক দিন আগে উত্তর গাজার শেষ হাসপাতালটি দখল করে সেটি আগুনে পুড়িয়ে দেয় ইসরায়েলি সেনারা। এদিকে শীতের তীব্র ঠান্ডা আর টানা বৃষ্টিতে অস্থায়ী তাবুতে বসবাসকারী মানুষজন শীতজনিত অসুস্থতায় মারা যাচ্ছে।
ইমান শাগনুবি নামের এক মা তার আট সন্তানকে নিয়ে ছোট একটি তাবুতে দিন কাটাচ্ছেন। “আমার সন্তানরা ভেজা বিছানায় ঘুমায়,” বলছিলেন তিনি। অন্যদিকে, শেরিন আবু নিদা তার স্বামীকে হারিয়ে চার সন্তান নিয়ে জীবন সংগ্রাম করছেন। মুসা আলি মুহাম্মদ আল-মাগরিবি, যিনি তার নয় সন্তানের জন্য খাবার আর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন না, বললেন, “প্রতিদিন আমরা শুধু মরার অপেক্ষায় থাকি।”
রাজনীতি ও নেতানিয়াহুর সমালোচনা
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধ বন্ধের কোনো লক্ষণ দেখাননি। বরং সমালোচকরা বলছেন, নিজের রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখতে এবং দুর্নীতির মামলাগুলো থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য তিনি এই সংঘাত দীর্ঘায়িত করছেন। ২০২৩ সালের হামাসের আক্রমণ নিয়ে জনমনে অসন্তোষ থাকলেও নেতানিয়াহু তার যুদ্ধনীতিতে অনড়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা
যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সাফল্য আনতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি জাতিসংঘের শান্তি উদ্যোগগুলোও ভেস্তে গেছে। ২০২৪ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক আদালত ইসরায়েলকে গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ দিলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এদিকে, ইসরায়েল জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা UNRWA-কে নিষিদ্ধ করেছে, যা গাজার মানুষের জন্য খাদ্য, চিকিৎসা ও অবকাঠামো সহায়তা প্রদান করত। এই নিষেধাজ্ঞা মানবিক সংকট আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গাজার মানুষের জীবনসংগ্রাম
গাজার বাসিন্দাদের জন্য নতুন বছর আশার পরিবর্তে আরও অনিশ্চয়তা বয়ে এনেছে। শেরিন আবু নিদার মতো অনেকেই বলেন, “এই বছরটি আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ বছর ছিল।” তবু যুদ্ধের অবসান ও শান্তির প্রত্যাশা এখনও তাদের মন থেকে মুছে যায়নি।
যুদ্ধ ও সংকটে বিধ্বস্ত গাজা এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগ ও সমাধানের অপেক্ষায়। শান্তি ফেরানো না গেলে এই অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে।