www.HelloBangla.News – আন্তর্জাতিক – ১১ জানুয়ারি, ২০২৫: হেটি গ্রিন, যিনি “ওয়াল স্ট্রিটের ডাইনি” নামে পরিচিত, তার সময়ের সবচেয়ে ধনী নারীদের একজন ছিলেন। তার সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার, যা বর্তমান সময়ে প্রায় ২ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারের সমান। কিন্তু এত ধনী হওয়া সত্ত্বেও, তিনি তার সম্পদের জন্য যতটা না পরিচিত ছিলেন, তার চেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন তার চরম কৃপণতার জন্য। ১৮৩৪ সালের ২১শে নভেম্বর ম্যাসাচুসেটসের নিউ বেডফোর্ডে জন্মগ্রহণ করা হেটি তার বাবা এবং খালার কাছ থেকে বিশাল পরিমাণ অর্থ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন, যা তিনি দক্ষতার সঙ্গে বিনিয়োগের মাধ্যমে বহুগুণ বাড়িয়েছিলেন। তবে তার এই সম্পদ বৃদ্ধির পেছনে ছিল তার অস্বাভাবিক মিতব্যয়ী জীবনযাপন।

এই প্রবন্ধে হেটি গ্রিনের জীবনের বিভিন্ন দিক এবং তার কৃপণতার অসাধারণ উদাহরণগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

জীবন এবং আর্থিক দৃষ্টিভঙ্গি

হেটি গ্রিন এমন একটি পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন, যেখানে অর্থ এবং আর্থিক কৌশল সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের প্রতি জোর দেওয়া হতো। তার বাবা একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন, যিনি তাকে ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা এবং বিনিয়োগের কৌশল শেখাতেন। অন্যান্য নারীদের মতো গৃহস্থালির কাজে না লেগে, হেটি ব্যস্ত থাকতেন আর্থিক প্রতিবেদনের বই পড়া এবং অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনা শিখতে।

তার বাবার মৃত্যুর পর হেটি প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন ডলার উত্তরাধিকার সূত্রে পান। তবে সেই অর্থ অযথা ব্যয় না করে তিনি সেগুলো রিয়েল এস্টেট, রেলপথ, সরকারি বন্ড এবং অন্যান্য লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করেন। তার বিনিয়োগ কৌশল ছিল অত্যন্ত সতর্ক কিন্তু কার্যকর, যার ফলে তার সম্পদ ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়।

 কৃপণ জীবনযাপন

বিশ্বের অন্যতম ধনী হওয়া সত্ত্বেও হেটি গ্রিন এমনভাবে জীবনযাপন করতেন, যেন তিনি সম্পূর্ণ দরিদ্র। তার কৃপণতার বিভিন্ন ঘটনা আজও মানুষের মনে বিস্ময় জাগায়। এখানে তার মিতব্যয়ী জীবনের কিছু চমকপ্রদ উদাহরণ তুলে ধরা হলো:

 একটি আন্ডারওয়্যার ব্যবহার

হেটি গ্রিন প্রতিদিন একই পুরানো কালো পোশাক পরতেন। এই পোশাক এতটাই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল যে, তাকে “ওয়াল স্ট্রিটের ডাইনি” বলা হতো। তিনি এই পোশাকটি ব্যবহার করতেন যতদিন না সেটি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যেত। এমনকি তিনি একমাত্র একটি আন্ডারওয়্যার ব্যবহার করতেন, যা বহু বছর ধরে চলত।

হেটির মতে, নতুন পোশাক কেনা অর্থের অপচয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, পোশাকের পেছনে খরচ করার চেয়ে সেই অর্থ বিনিয়োগ করাই বেশি লাভজনক।

হিটার ব্যবহার না করা

শীতকালে তীব্র ঠান্ডা থাকা সত্ত্বেও হেটি গ্রিন তার বাড়িতে হিটার ব্যবহার করতেন না। তিনি মনে করতেন, হিটার ব্যবহার করা মানে বাড়তি খরচ। তিনি ঠান্ডা পানিতেই গোসল করতেন এবং শীতের রাতে গরম কাপড় পরে কাটিয়ে দিতেন। এমনকি শীতের মধ্যেও তিনি বাড়ির মধ্যে অন্ধকারে বসে থাকতেন, কারণ আলো জ্বালাতে মোমবাতির খরচ বাড়বে।

সস্তা খাবার খাওয়া

হেটি গ্রিনের খাবারের তালিকায় থাকত অত্যন্ত সস্তা এবং সাধারণ খাবার। তিনি কখনোই দামি খাবার খেতেন না। কথিত আছে, তিনি একবার ওটমিল খেতে গিয়ে দুধ গরম করার খরচ বাঁচানোর জন্য ঠান্ডা দুধে ভিজিয়ে খেয়েছিলেন।

ছেলের চিকিৎসায় কৃপণতা

হেটি গ্রিনের কৃপণতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো তার ছেলে নেড গ্রিনের চিকিৎসার ঘটনা। একবার নেড তার পায়ে গুরুতর আঘাত পেলে, হেটি তাকে কোনো অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে সস্তায় চিকিৎসার জন্য দাতব্য হাসপাতালে নিয়ে যান। সঠিক চিকিৎসার অভাবে নেডের পায়ে সংক্রমণ হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তার পা কেটে ফেলতে হয়।

এই ঘটনাটি জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করে। অনেকেই মনে করতেন, এত ধনী হওয়া সত্ত্বেও তার সন্তানের চিকিৎসায় কৃপণতা করা অত্যন্ত অমানবিক।

অফিস ভাড়া না নেওয়া

হেটি গ্রিন কখনো নিজের জন্য আলাদা অফিস ভাড়া করেননি। তিনি বিভিন্ন ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকদের ডেস্কে বসে তার ব্যবসার কাজ করতেন। ব্যাংকের কর্মচারীরা তাকে প্রায়ই বিদ্রূপ করত, তবে তাতে তিনি কোনো কর্ণপাত করতেন না।

হোটেলে থাকা এড়িয়ে যাওয়া

ব্যবসায়িক কাজে যখন তাকে বিভিন্ন শহরে যেতে হতো, তখন হোটেলে না থেকে তিনি আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে থাকতেন। তবে সেখানেও তিনি খাবার খেতেন না, কারণ এতে অর্থ খরচ হবে। তিনি তার সঙ্গে সস্তা খাবার নিয়ে যেতেন এবং সেই খাবার খেয়ে কাজ চালাতেন।

ট্যাক্স বাঁচানোর কৌশল

নিউইয়র্কে করের হার বেশি হওয়ায়, হেটি গ্রিন প্রায় ২০ বছর নিউ জার্সির হোবারকেন শহরে বসবাস করেন। সেখানে কর কম ছিল, ফলে তিনি প্রচুর অর্থ সাশ্রয় করতে পেরেছিলেন। কর দেওয়ার ভয়ে তিনি নিয়মিত নিজের ঠিকানা পরিবর্তন করতেন।

বিনিয়োগ কৌশল

হেটি গ্রিনের ব্যক্তিগত জীবন যতটা মিতব্যয়ী ছিল, তার বিনিয়োগ কৌশল ততটাই চতুর এবং সফল ছিল। তিনি মূলত রিয়েল এস্টেট, রেলপথ এবং সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করতেন। অর্থনৈতিক মন্দার সময় যখন অন্যরা আতঙ্কে তাদের সম্পদ বিক্রি করত, তখন তিনি সেই সম্পদ কম দামে কিনে নিতেন।

১৯০৭ সালের আর্থিক মন্দার সময়, যখন অনেকেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন হেটি গ্রিন প্রচুর নগদ অর্থ ঋণ দিয়ে আরও বেশি মুনাফা অর্জন করেন। তার এই কৌশল তাকে আরও ধনী করে তোলে।

 উত্তরাধিকার

হেটি গ্রিনের কৃপণতা এবং বিনিয়োগ দক্ষতা তাকে জনসাধারণের কাছে আলোচনার বিষয় করে তুলেছিল। অনেকেই তার আর্থিক কৌশলের প্রশংসা করলেও, তার চরম মিতব্যয়িতা নিয়ে সমালোচনা করেছেন।

১৯১৬ সালে হেটি গ্রিন মারা যান, তখন তার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার। তার দুই সন্তান নেড এবং সিলভিয়া তার সম্পদ উত্তরাধিকার সূত্রে পান এবং তাদের জীবনযাপন ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন।

হেটি গ্রিনের জীবন একটি দ্বৈততার প্রতীক। একদিকে তিনি একজন অত্যন্ত সফল বিনিয়োগকারী এবং ধনী নারী ছিলেন, অন্যদিকে তার কৃপণ জীবনযাপন তাকে মানুষের মনে রহস্যময় এবং কৌতূহলের বিষয় করে তুলেছিল। তার জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিষয় হলো, সম্পদ অর্জন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই সম্পদ সঠিকভাবে ব্যয় করাও সমান প্রয়োজন।

হেটি গ্রিন তার আর্থিক দক্ষতার জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, তবে তার কৃপণতার জন্যও মানুষের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন।